বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রম, কমছে নাড়ির টান

0
220

‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার। নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি, সবচে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি…’ নচিকেতার এই গানটি নবীন বয়সে শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। ভালোবাসা, মায়া-মমতা দিয়ে সন্তানকে বড় করার পর অনেক বাবা-মায়ের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। কেননা তারা তো বৃদ্ধ, কর্মক্ষম নন। যে বাবা-মা এক সময় শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের বোঝা মনে করছে অনেক সন্তান। তখন তাদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঠাঁই হয় প্রবীণ নিবাসে। আবার অনেক প্রবীণ পরিবারের সঙ্গে থাকলেও প্রতিনিয়তই বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হন।

তাই এ বিষয়ে নবীনদের সচেতন করে তুলতে প্রতিবছর ১ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রবীণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষতা সাধনের ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। প্রবীণদের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগেরও বেশি প্রবীণ। আর বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার ঊর্ধ্বের ব্যক্তিকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। সে হিসেবে এ দেশের প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ নাগরিক প্রবীণ। বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বৃদ্ধদের এখনো সেবা-সম্মান করা হয়। তবে দিন দিনই যাচ্ছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি। তাই বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা। নিজের গড়া সংসার ছেড়ে সেগুলোতেই ঠাঁই হচ্ছে প্রবীণদের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, প্রবীণরা সমাজের বোঝা নয়। তারা সম্মানিত। অতীতে তারা পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেক কিছুই করেছেন। তাদের যেন কোনোরকম অবহেলা করা না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা যারা নবীন, তারা যেন ভুলে না যাই একদিন এই অবস্থায় আমরাও উপনীত হব। আজ যদি আমরা তাদের প্রতি অবহেলা করি, তা হলে আমাদেরও অবহেলার শিকার হতে হবে।

এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রবীণরা অবহেলিত, উপেক্ষিত, সমাজ ও পরিবারের কাছে বোঝা স্বরূপ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রবীণরা আমাদের পরিবারেরই অংশ। অন্য সদস্যের মতোই তার সঙ্গে আচার-আচরণ করতে হবে। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত, প্রবীণদের আদর-যত্ন দিয়ে শিশুদের মতো প্রতিপালন এবং তাদের প্রতি মায়া, মমতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশে প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধ নিবাস বা ওল্ড হোমের ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজনে আমাদের দেশেও এর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবীণরা যাতে স্বল্প ব্যয়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা পান সে জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতলের ব্যবস্থাও করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে তাদের জন্য আলাদা বিছানা বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ তাদের বিনামূল্যে বা কম দামে দেওয়া উচিত। প্রবীণদের চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত বিভাগ খোলা দরকার। এমনকি গণপরিবহনে (বাস, ট্রেন, লঞ্চ ইত্যাদি) সংরক্ষিত আসন রাখা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে যাওয়া প্রবীণদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড় না করিয়ে আলাদা কাউন্টারের মাধ্যমে বিল গ্রহণের ব্যবস্থা করা উচিত। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও তাদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত, যাতে তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ও অবহেলিত মনে না করেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ প্রবীণ হিতেষী সংঘের মহাসচিব ড. এএসএম আতীকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণ আছেন এক কোটি ৪০ লাখ। আগামী ২০২৫ সালে এ সংখ্যা হবে দুই কোটি এবং ২০৫০ সালে সাড়ে চার কোটি। সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষ বার্ধক্য সম্পর্কে প্রস্তুত নয়। প্রবীণদের বিরাট একটি অংশ হচ্ছে দরিদ্র ও গ্রামীণ এলাকার। তবে ১৯৯৮ সাল থেকে বয়স্কভাতা কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। বর্তমানে ৩৫ লাখ প্রবীণ দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা ভাতা পাচ্ছেন। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩, প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশনও করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সারা বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বাড়ছে। তবে দুঃখজনক ঘটনা হলো প্রবীণরা আজ ভালো নেই। তাদের প্রায় ৪৬ শতাংশ নিজেদের বাড়িতেই নানা প্রকারের নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হয়ে মারাত্মক শারীরিক ও আবেগীয় সমস্যায় পতিত হচ্ছেন। প্রবীণের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমাজে তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের মাত্রাও বেড়ে চলছে। পৃথিবীর লাখ লাখ প্রবীণ ব্যক্তি স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিষয়টি আজ একটি বৈশ্বিক সামাজিক ইস্যুতে পর্যবসিত হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববাসীর সক্রিয় নজরদারি প্রয়োজন।’

জাতিসংঘের তথ্যমতে, স্বাস্থ্য সচেতনতা, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং যাতায়াত-যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নয়নের কারণে মানুষের গড় আয়ুষ্কাল বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রবীণরা দুর্ব্যবহার, অবহেলা, নির্যাতন এবং শোষণের সম্মুখীন হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। প্রায় সব প্রবীণই কোনো না কোনো ধরনের দুর্ব্যবহারের শিকার হন, তবে অধিকাংশের ঘটনাই থাকে অনুচ্চারিত।

বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের এখনো সেবা-সম্মান করা হয়। কিন্তু তাদের প্রতি অবহেলা, অযত্ন, দুর্ব্যবহার আর নির্যাতনের ঘটনা এখনো কম নয়। প্রবীণদের প্রতি এমন আচরণের বিষয়ে আমরা কেউই পর্যাপ্ত মাত্রায় অবহিত ও সচেতন নই। দেশের চলমান শিক্ষা পাঠ্যসূচি, গণমাধ্যম কর্মসূচি কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতেও বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো সাড়া নেই। কিন্তু এখনই আমাদের সাবধান এবং উদ্যোগী হওয়া জরুরি। কেননা বার্ধক্য হচ্ছে প্রতিটি মানুষের অবধারিত সমস্যা। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রবীণদের দেখভাল করতে হবে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here