চার দিনে রোহিঙ্গা ঢুকেছে ১৮ হাজার

0
69

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে হামলা-সহিংসতা শুরুর পর থেকে দলে দলে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও তা ঠেকানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত চার দিনে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা। গতকাল বুধবার কত সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে- সংস্থাটি তা জানাতে পারেনি। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গতকাল একদিনেই সর্বাধিক সাত হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। উখিয়া ও টেকনাফের তিনটি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছে। এদিকে, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তা করায় টেকনাফের হ্নীলায় যুবদলের এক নেতাকে অর্থদণ্ড করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা নতুন করে অনুপ্রবেশ করলেও তাদের নিয়ে কক্সবাজার ও বান্দরবানের স্থানীয় সরকারি প্রশাসন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। তাদের কোথায় রাখা হবে- এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, নতুন আসা রোহিঙ্গারাও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের জন্য তা গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের বিষয়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে যাচ্ছে। তাদের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

আইওএমের কক্সবাজার অফিসপ্রধান সংযুক্তা সাহানী গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। চার দিনে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা আসার তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন পয়েন্টে আরও বহু সংখ্যক রোহিঙ্গা জড়ো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুড়ছে গ্রাম, মরছে মানুষ : অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, রাখাইনে দেশটির সেনাসদস্যদের দমন অভিযান এখনও চলছে। তারা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) বিরুদ্ধে অভিযানের নামে নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের এপার থেকেও দেখা যাচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা। স্যাটেলাইট ইমেজ দেখে আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটওয়াচ জানিয়েছে, পুরো রাখাইনে অন্তত ১০টি স্থানে আগুনে ব্যাপক ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। আরাকান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল বুধবারও রাচিদংর চেইনখালিপাড়ায় রোহিঙ্গাদের প্রায় এক হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। পোড়ানো হয়েছে মংডুর নয়াপাড়া, সুন্দরীপাড়া, সিকদার বিল, কাউয়ার বিল, নাপুড়া, ঢেকিবনিয়া, ফকিরপাড়াসহ রোহিঙ্গাদের আরও অনেক গ্রাম। হামলা-সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১১০ জন নিহত হয়েছে বলে এএফপির খবরে বলা হয়েছে।

উত্তর মংডুর স্কুলশিক্ষক উ মং নি আরাকান টাইমসকে জানান, মঙ্গলবার ওই এলাকার তিইকুনপাড়ার অন্তত দুইশ’ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হত্যা করা হয় অর্ধশত রোহিঙ্গাকে।
বুচিদংয়ের আলীকেতন গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা সাইফুল আমিন (২৭) জানান, সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের অনেকে আরসায় যোগ দিচ্ছে। তার তিন ভাই এরই মধ্যে যোগ দিয়েছে। রাখাইন থেকে একজন এনজিওকর্মী টুইটে জানান, সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের কারণে আরসার প্রতি সাধারণ রোহিঙ্গাদের সমর্থন ও সহানুভূতি বাড়ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে লিখেছেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাখাইনের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে।

সীমান্তে জড়ো হচ্ছে রোহিঙ্গারা : গতকাল সকালে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির গুনদুম ইউনিয়নের জলপাইতলী সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, জিরো লাইনে প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় রয়েছে। ওই স্থানে থাকা বিজিবির একজন সদস্য জানান, দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানে ১৫ থেকে ২০ ফুটের খালে হাঁটুপানি রয়েছে। তা দিয়ে সহজেই রোহিঙ্গারা এপারে চলে আসতে পারে। স্থানীয় মোজাফ্ফর আহমদ জানান, রোহিঙ্গারা রাতের অপেক্ষায় থাকে। সন্ধ্যা নামলেই তারা দলে দলে এপারে ঢুকে পড়ে।

এদিকে, গতকাল অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে বিজিবির হাতে ৭৫ ও সেন্টমার্টিনে কোস্টগার্ডের হাতে ৭৭ রোহিঙ্গা আটক হয়। তাদের মানবিক সহযোগিতা দিয়ে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক।

আরসাপ্রধানের নতুন বার্তা : আরসার প্রধান কমান্ডার আতা উল্লাহ ওরফে আবু আম্মার জুনুনি গতকালও একটি ভিডিওবার্তা প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। রাখাইনে আহতদের চিকিৎসায় কোনো মেডিকেল টিম ও ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠন ও এনজিওগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। এর আগে মঙ্গলবার একটি অডিওবার্তায় আতা উল্লাহ সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় আরসার দুই মুখপাত্রের নাম ঘোষণা করেন।

রোহিঙ্গা নিয়ে দালালদের বাণিজ্য : রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সুযোগে সীমান্ত এলাকার কিছু দালাল ও হুন্ডি ব্যবসায়ী হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল টাকা। স্থানীয়রা জানান, নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তারা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিচ্ছে। এরপর তাদের কুতুপালং, গুনদুম অথবা লেদা ক্যাম্পে নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের অনেকের আত্মীয়স্বজন মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে। স্বজনদের জন্য তারাও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছে। এই সীমান্ত এলাকার কিছু হুন্ডি ব্যবসায়ীও বিপুল টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

যুবদল নেতাকে অর্থদণ্ড : হ্নীলা দক্ষিণ যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সলিমকে অর্থদণ্ড করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জানা যায়, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তা করার অপরাধে তাকে টেকনাফ থানা পুলিশ আটক করে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সলিমকে অর্থদণ্ড করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেতৃত্বদানকারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক।

নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ : টেকনাফে বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গারা স্থানীয় কিছু দালালচক্রের সহযোগিতায় মাছ ধরা নৌকায় এপারে চলে আসছে। তাই সাময়িকভাবে নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, রোহিঙ্গারা এখন উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের স্থলভাগ ব্যবহার করে হেঁটে অনুপ্রবেশ করছে।

নৌকাডুবি, চার রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার : বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপ পয়েন্টে রোহিঙ্গাবোঝাই একটি নৌকাডুবি হয়। গতকাল সকালে সাবরাং শাহপরীর সৈকত থেকে স্থানীয়রা চারজনের লাশ উদ্ধার করে। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল আমিন জানান, নিহতের মধ্যে দুই নারী ও দুই শিশু রয়েছে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here