আফগান নীতি ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

0
102

২১ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্লিংটনের ফোর্ট মেয়ার সামরিক ঘাঁটিতে জাতি ও সেনাদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। বক্তৃতায় আফগানিস্তানবিষয়ক মার্কিন কৌশলের পর্যালোচনা পেশ করেছেন। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি আফগানিস্তানে সেনা শুধু রাখবেনই না; বরং সেখানে সেনাসংখ্যা বাড়াতে চান, সেনা প্রত্যাহার তো দূরস্থান। এতে আফগান নীতিতে ট্রাম্পের বড় ধরনের অবস্থান পরিবর্তন হলো। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কী পর্যায়ের হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। এ ছাড়া কাবুল সরকারসহ সেখানে ক্রিয়াশীল অন্যান্য শক্তি, যার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান অগ্রগণ্য, এই নীতি কবুল করবে কি না এবং সেখানে টেকসই শান্তি নিশ্চিত করা যাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন আফগান নীতিতে পূর্বসূরি বারাক ওবামার নীতির দুটি ধারা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। প্রথমত, পুরো আফগান ইস্যুটি সেনা মেতায়েনের সংখ্যায় নামিয়ে আনা; দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কৌশল ও অভিযানগত অপরিহার্যতার মধ্যে বাঁধা পড়া। নতুন আফগান নীতি ও অঙ্গীকার মাঠের বাস্তবতার নিরিখে প্রণীত হবে, যে প্রক্রিয়াকে ট্রাম্প ‘নীতিভিত্তিক বাস্তববাদ’ ও ‘কৌশলগত বলপ্রয়োগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে বিদ্যমান সাড়ে আট হাজার পাশাপাশি আরও চার হাজার সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে শুধু আফগান সরকারের ব্যাপারে রাজনৈতিক ও প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, বিশেষ করে এটা ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি উদ্দিষ্ট। অর্থাৎ আফগানিস্তানে তারা কী ভূমিকা পালন করে, তার ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করবে। এখন থেকে তাদের ভূমিকা আরও বেশি করে ধর্তব্যে নেওয়া হবে। এ ছাড়া পরিষ্কারভাবে উল্লিখিত না থাকলেও এটা নিশ্চিত, ট্রাম্প ইরান, চীন ও রাশিয়াকেও বার্তা দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র আফ-পাক অঞ্চল বা তার বাইরে থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে না। বার্তা হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সম্প্রতি ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তামহলে দেশটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেটা আফগান সরকারের বড় উদ্বেগের কারণ।

এ ছাড়া সামরিক বিবেচনায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করলেও বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। প্রকৃতপক্ষে ‘সংশোধিত আফগান কৌশলে’ এমন কোনো ‘ধূর্ততা নেই’ যা দিয়ে আফগানিস্তানের পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। একভাবে বললে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে। যাহোক, যুক্তরাষ্ট্র আরও আগেই আফগানিস্তানে কর্মরত সেনা কমান্ডের ক্ষমতা বাড়িয়েছে, যার ধারাবাহিকতা আগামী দিনেও আমরা দেখতে পাব। যুক্তরাষ্ট্র সেনাদের ব্যষ্টিক ব্যবস্থাপনার রীতি থেকে কিছুটা সরে এসেছে। তা সত্ত্বেও আফগানিস্তানে নতুন সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তে হয়তো আফগান সরকারের সম্ভাব্য পরাজয় ও তালেবান বিদ্রোহীদের ঠেকানো যাবে। কৌতূহলের ব্যাপার হলো, ট্রাম্প আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কী করণীয় সে সম্পর্কে পূর্বসূরি
বারাক ওবামার কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছেন। অর্থাৎ হোয়াইট হাউস এখন জাতি গঠন বা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতি
দিয়ে সফলতা বিচার করবে না; বরং এই অঞ্চলে সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদ কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে, তা দিয়েই সফলতা নির্ধারণ করা হবে।

সন্দেহ নেই, বারাক ওবামার আফগান নীতি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনেক আগেই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এত দিন ট্রাম্প আফগানিস্তান প্রসঙ্গে তেমন কিছু বলেননি। তিনি বরং দক্ষিণ চীন সাগর, উত্তর কোরিয়া, চীন, সিরিয়া, ইরান—প্রভৃতি বিষয়ে মনোযোগ দিয়েছেন। যাহোক, মার্কিন প্রশাসনের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো ভবিষ্যৎ আফগান নীতি প্রণয়নে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তেমন কোনো ভালো বিকল্প ছিল না। তবে আফগানিস্তান থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করা হলে শুধু আফগানিস্তানের পতনই হবে না। কারণ, এরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলই নয়, পরিষ্কারভাবে তারা দেশটির সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করে টেকসই ফলাফল পাওয়া যায়নি, সেখানে যখন সর্বোচ্চ সেনা মোতায়েন ছিল, তখন মার্কিন সেনা ছিল ১ লাখ আর ন্যাটো সেনা ছিল ৪০ হাজার। এতে অচলাবস্থার নিরসন হয়নি। কিন্তু সেনাসংখ্যা কিছু বাড়ানো হলে আল-কায়েদা ও আইএসকে বোতলবন্দী রাখা সম্ভব হবে।

এদিকে পাকিস্তান তো আফগান তালেবান, হাক্কানি নেটওয়ার্ক, লস্কর-ই-তাইয়েবা, জয়শ-ই-মোহাম্মদ প্রভৃতি সংগঠনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। তাই আমরা আশা করি, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শেষমেশ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেখা গেল, ট্রাম্প পাকিস্তানের ওপর আরও চাপ দেওয়ার আহ্বান জানালেন। কিন্তু ওয়াশিংটন এবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কত দূর যায়, সেটাই দেখার বিষয়। কারণ, এত দিন তো তারা ‘ক্লিয়ার অ্যান্ড রেজল্যুট’ (পরিষ্কার ও সংকল্পবদ্ধ) ছিল। অর্থাৎ ওয়াশিংটন শেষমেশ কথা ও কাজে এবং পাকিস্তানকে আফগানিস্তান ও ভারতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা থেকে বিরত করে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওয়াশিংটন পাকিস্তানে সহায়তা দেওয়া বন্ধ, তাকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক আখ্যা দেওয়া বা তার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে, যেমনটা তারা ইরানের বেলায় করেছে। কিন্তু সামরিক হস্তক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া যাবে না। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা হয়তো চলবে। কিন্তু পাকিস্তানে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে হয়তো বিশেষ অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কমে যাবে, যেভাবে তারা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করেছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনে এখনো অনেকে আছেন, যাঁরা মনে করেন শান্তি প্রক্রিয়া ও আলোচনায় পাকিস্তান এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতিতে বোঝা গেল, পাকিস্তানের ব্যাপারে তাঁর ক্রমশ মোহভঙ্গ ঘটছে।

গত ১৬ বছরের মতো ট্রাম্পের জমানায়ও এটা আশা করা ঠিক হবে না যে শান্তি আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই শান্তি আলোচনায় মূল নজর দেয় না। তারা সব সময় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পেশিশক্তির প্রদর্শনী করে। ফলে সব শান্তি আলোচনাই ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে তালেবান ও আইএসও শান্তি আলোচনায় আগ্রহী নয়। আর তাদের শরিয়া আইন ও ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রের দাবি নিয়ে তো আলোচনা করার অবকাশ নেই।

অন্যান্য খেলোয়াড়ের মতো চীন ও রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তি ওয়াশিংটনের নীতি প্রণয়নে কী ভূমিকা পালন করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আশা করা যায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে তালেবানদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো ট্রাম্প কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তরিকা নতুন আফগান নীতির অংশ মনে করেন। এ ছাড়া তিনি ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করেন, যারা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভূমিকা পালন করে যাবে। ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মতো চিরশত্রুকে নিয়ে ওয়াশিংটন কীভাবে আফগানিস্তানে তার কার্যক্রম সমন্বয় করে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ট্রাম্পের নীতি শুধু আফ-পাক অঞ্চলেরই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন

ড. সিগফ্রিড ও উলফ: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here