গবাদিপশু আমদানিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

0
59

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে প্রতিবছরই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে গবাদিপশু আমদানি করা হয়। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর এই আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি বলে মনে হয়। গরু আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় একদিকে যেমন দেশীয় খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে আমদানি করা এসব গবাদিপশুর মাধ্যমে দেশের মানুষ ও পশুপাখির স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এবারের বন্যায় গোখাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে দিশেহারা কৃষক ও খামারিরা তাঁদের গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। পানির দামে বিক্রি করার উপক্রম হয়েছে এসব গবাদিপশু। এর ওপর গবাদিপশুর ব্যাপক আমদানি দেশের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, ‘দেশে যে পরিমাণ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আছে, তা কোরবানির চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট। সারা বছর প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ ১৩ হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর প্রায় ৫০ শতাংশই জবাই হয় কোরবানির ঈদের সময়। সে হিসাবে কোরবানির সময় ১ কোটি ১৫ লাখের মতো গবাদিপশু দরকার হবে। এ পরিমাণ গবাদিপশু দেশের খামারি ও গৃহস্থের ঘরে রয়েছে।’ সারা বছর দেশের খামারিরা যে আশায় গবাদিপশু লালন-পালন করেন, ঈদের আগে এভাবে গবাদিপশু আমদানি করলে খামারি ও কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ব্যাংকঋণ নিয়ে লালন-পালন করা এসব পশুর ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষক ও খামারিরা ঋণগ্রস্ত থেকে যাবেন এবং তাঁরা গবাদিপশু পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। ফলে এই শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।

রোগমুক্ত পশু ও পশুজাত পণ্য আমদানির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ২০১৩ সালে প্রকল্পের মাধ্যমে ১৭টি জেলায় ২৪টি সঙ্গনিরোধ প্রতিষ্ঠান (কোয়ারানটাইন স্টেশন) চালু করে। এসব স্টেশনের মধ্যে দুটি কোনো রকমে চালু আছে। অন্যগুলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জনবল ও সঙ্গনিরোধ কর্মকর্তার অভাবে অচল অবস্থায় রয়েছে।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে বৈধ ও অবৈধ পথে আসে এসব গবাদিপশু। বৈধ পথে আমদানির ক্ষেত্রে সীমান্তের জিরো পয়েন্ট থেকে ভারতীয় ও মিয়ানমারের রাখালেরা গরুর চালান বাংলাদেশি রাখালদের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে সেই গরুগুলো বিটে বা খাটালে (সাময়িকভাবে রাখার জায়গা) রাখা হয়। এরপর সরকারি শুল্ক বাবদ গরুপ্রতি ৫০০ টাকা ও বিট কর্তৃপক্ষকে ৫০ টাকা পরিশোধ করে গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। সরকারি শুল্ক ফাঁকি রোধে গবাদিপশু আমদানির ব্যবস্থাপনায় বিট বা খাটাল নিয়ম ব্যবহার করা হলেও রোগাক্রান্ত পশু প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে আপাতত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অথচ রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগমুক্ত গবাদিপশু ও পশুজাত পণ্য আমদানির জন্য রয়েছে সঙ্গনিরোধ আইন (কোয়ারানটাইন আইন) ২০০৫। সঙ্গনিরোধ আইনের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি বৈধ আমদানি লাইসেন্স এবং স্বাস্থ্য সনদ ব্যতিরেকে কোনো পশু বা পশুজাত পণ্য আমদানি করা হয় এবং যদি ওই পশু সংক্রামক ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত না হয় বা পশুজাত পণ্য যদি সংক্রমিত না হয়, তাহলে সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা নিষ্পত্তি করতে পারবে। এই আইন অনুযায়ী সঙ্গনিরোধের জন্য  পশু এবং পশুজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং তিনি নির্ধারিত পদ্ধতিতে পশু এবং পশুজাত পণ্যের সঙ্গনিরোধ সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কিন্তু সঙ্গনিরোধ আইনের যথাযথ প্রয়োগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় আমদানি করা গবাদিপশু ও পশুজাত পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে। অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত গবাদিপশু দেশের মানুষ ও পশুপাখির যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশ যখন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপদ খাদ্যের স্লোগান দিচ্ছে, সেখানে সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া পশু আমদানি মোটেই সমীচীন নয়।

পশুকে বাহ্যিকভাবে সুস্থ মনে হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এদের রোগমুক্ত বলা যায় না। বিট বা খাটালে গবাদিপশু গাদাগাদি করে থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নানা রোগে আক্রান্ত এসব পশুর সরাসরি বা মলমূত্রের সংস্পর্শে এসে সুস্থ পশু ও রাখাল বা ব্যবসায়ীরা আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া এসব পশু জবাইয়ে রক্ত ও আক্রান্ত মাংস, নাড়িভুঁড়ি, কলিজা, কিডনি, মগজ বা অন্য কোনো আক্রান্ত অঙ্গ মানুষ, বিড়াল, কুকুর, শিয়াল বা অন্য কোনো মাংসাশী প্রাণী খেয়ে থাকে, যারা পরে এসব রোগের জীবাণু সুস্থ গবাদিপশু ও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। আমদানি করা রোগাক্রান্ত পশুর সঙ্গে আসা মশা, মাছি, আঠালি ও মাকড় দেশের ভেতরে রোগের জীবাণুসহ ছড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

বর্তমানে দেশে ৫ লাখের মতো খামার গড়ে উঠেছে। দেশের প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে দরকার প্রায় ১৫ হাজার গরু। বিপুল এই চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকলে সীমিত পরিসরে নিয়ন্ত্রিতভাবে আমদানি করা যেতে পারে। তবে অবৈধভাবে পশু ও পশুজাতপণ্য আমদানি বন্ধ করতে হবে। শুধু বাহ্যিকভাবে পশুটিকে দর্শন করে স্বাস্থ্য সনদ প্রদান না করে গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সঙ্গনিরোধ আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করে প্রদেয় স্বাস্থ্য সনদ ছাড়া গবাদি-পশুপাখি আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে।

দেশের মানুষ ও গবাদিপশুর নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষি ও পশুজাত পণ্য, কীটপতঙ্গ, গবাদিপশু ও গোখাদ্য নিয়ন্ত্রণে সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সঙ্গনিরোধ আইনের যথাযথ প্রয়োগে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল থাকতে হবে। বাইরের দেশের মতো শুল্ক বিভাগে টেকনিক্যাল অফিসার হিসেবে ভেটেরিনারিয়ান ও কৃষি গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি নিরাপদ গবাদিপশুর উৎপাদন বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। দুধ ও মাংসের জন্য গরু আমদানি বন্ধ হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। গোখাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ও রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা যাবে।

আমদানির মাধ্যমে অধিক সংক্রমণ ও ছোঁয়াচে রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কোয়ারানটাইন স্টেশনে রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যথায় নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে। পশু ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হবে।

মো. সহিদুজ্জামান: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

szaman@bau.edu.bd

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here