বন্যা ত্রাণ বরাদ্দ করার চেয়ে বেশি জরুরি সুষ্ঠু বিতরণ

0
154

গাইবান্ধা শহর থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ১৬ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কামারজানি বাজার। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে প্রাচীন এক নদীবন্দর এটি। একসময় এই বন্দরে স্টিমার আসত, সেই স্টিমারে চেপে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ তো বটেই, এমনকি কলকাতা পর্যন্ত যাওয়া যেত। ধান,

পাট ও ভুট্টার বড় বড় চালান নিয়ে বিশাল বিশাল নৌকা এখনো এই বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জে যায়।

রোববার সন্ধ্যার একটু আগে কামারজানি বাজার থেকে একটা খোলা নৌকায় উঠলাম। মাঝিকে বললাম, আমরা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাই। যুবক মাঝি আমাদের নিয়ে উত্তর দিকে চললেন। ব্রহ্মপুত্র এখানে যমুনার মতো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। তার পুবে ও পশ্চিমে জনবসতি দেখা যাচ্ছে; দুই-আড়াই মাইল চওড়া সুগঠিত শরীর নিয়ে সে প্রবলভাবে বয়ে চলেছে। তার ঘোলা পানি পাক খেয়ে খেয়ে ছুটে চলেছে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে।

নদীর পশ্চিম তীরের কাছ দিয়ে নৌকায় যেতে যেতে দেখতে পেলাম, খাড়া হয়ে পাড় ভাঙছে। পাড়ে ঘরবাড়ি ও গাছপালা; নদীর পাড় যেভাবে ভাঙছে তা দেখে বোঝা যাচ্ছে অচিরেই সেগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এসব দেখতে মাইল দু-এক পেরিয়ে যাওয়ার পর আমাদের নৌকা পাড়ে ভিড়ল, মাঝি আমাদের হাত ধরে টেনে তুলে পাড়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এরই মধ্যে সেখানে কিছু নারী, পুরুষ ও শিশু জড়ো হয়েছে। আমাদের দেখে তারা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল। আমি বললাম, ‘আপনারা কেমন আছেন?’

স্যান্ডো গেঞ্জি পরা বয়স্ক এক লোক সবুজ রঙের প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ছিলেন। তিনি বললেন যে তাঁরা নিজ নিজ ঘরবাড়ি পাহারা দিচ্ছেন। ব্রহ্মপুত্র এখন তাঁদের সাক্ষাৎ শত্রু, সে পাড় ভাঙতে ভাঙতে চলে এসেছে তাঁদের উঠান পর্যন্ত, তাঁদের ঘরবাড়ি গ্রাস করবে বলে। কখন ঘরের টিন-খুঁটি খুলে গেরস্থালি সরঞ্জাম গুটিয়ে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে বেরোতে হয়, সেই শঙ্কায় দিন গুনছেন।

জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে বন্যা হয়নি?

‘হয়নি বলে!’ একসঙ্গে খেদোক্তি প্রকাশ করলেন কয়েকজন নারী। তাঁরা বললেন, বানের পানি নদীর পাড় উপচে তাঁদের ঘরবাড়ি ডুবিয়ে দিয়েছিল। এক নারী নিজের বুক বরাবর হাত তুলে দেখালেন: এই পর্যন্ত পানি উঠেছিল। তখন তাঁরা দূরের এক মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০ দিন ধরে তাঁরা সেখানেই ছিলেন। পানি নেমে যাওয়ার পর ফিরে এসেছেন, সেটা মাত্র কয়েক দিন আগের কথা, এখনো তাঁদের গরু-বাছুরগুলো আশ্রয়কেন্দ্রেই রয়ে গেছে।

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের এই গ্রামের নাম পোড়ার চর। ২৬টি পরিবারের শ দুয়েক মানুষের বাস। সবাই ভূমিহীন, অন্যের জমি আধি নিয়ে চাষবাস করেন; কেউ ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালান বা অন্য কোনো কাজ করেন। ব্রহ্মপুত্রের পুব পাড়ে তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা ছিল, সেগুলো নদীগর্ভে বিলীন হলে তাঁরা পশ্চিম পাড়ে এসে উঠেছেন তিন বছর আগে। নদীভাঙনের কারণে তাঁদের কয়েক বছর পরপরই বাসস্থান বদলাতে হয়। ২৫ বছর বয়সী এক নারী বললেন, তাঁর ১০ বছরের বিবাহিত জীবনে এই অভিজ্ঞতা হয়েছে ৮ বার।

বন্যার ত্রাণ-সাহায্য পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে একজন বললেন, একবার শুধু ১০ কেজি চাল পেয়েছেন। কিন্তু আসলে ১০ কেজি নয়, বললেন তিনি চাল মেপে দেখেছেন ৮ কেজি। আরেক নারী বললেন, তিনি কিছুই পাননি। তাঁরা সবাই সাহায্য চান। তবে তার চেয়ে বেশি চান নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে। বয়স্ক লোকটি বললেন, কত জায়গায় নদীর পাড় বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সেভাবে তাঁদের ঘরের পাশেও যদি নদীর পাড় বেঁধে দেওয়া হতো, তাহলে সরকারের কাছে তাঁদের আর কোনো চাওয়া থাকত না। তাঁরা এখন বন্যার কথা আর ভাবছেন না। বলছেন, বন্যা চলে গেছে, কিন্তু রাক্ষুসে নদীটা তো রয়ে গেছে। এই নদীর জন্য তাঁদের অশান্তির শেষ নেই। রাতে দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেন না, কখন চাঁই চাঁই মাটি নদীর পানিতে ভেঙে পড়ার শব্দে জেগে উঠে ঘরের টিন খোলা শুরু করতে হয়। গ্রামটির যেসব পুরুষ ঢাকা ও অন্যান্য শহরে গিয়ে রুজি-রোজগার করেন, এখন তাঁরাও ভাঙনের দুশ্চিন্তায় গ্রাম ছেড়ে যেতে পারছেন না: ‘কখন বাড়ি টান দেওয়া লাগে’। কিন্তু গ্রামে এখন তাঁদের কোনো ‘কর্ম নাই; তাঁরা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন ভাঙনরত রাক্ষুসে নদীটার দিকে চেয়ে।

পোড়ার চরের মানুষের চেয়ে বেশি দুর্দশায় আছেন ব্রহ্মপুত্রের পুব পাড়ের দক্ষিণ খাটিয়ামারি চরের মানুষ। বন্যার পানি এখনো জনপদ থেকে সরে যায়নি। মঙ্গলবার দুপুরে গাইবান্ধার বালাসি ঘাট থেকে নৌকায় প্রায় দুই ঘণ্টা যাওয়ার পর তাঁদের কাছে পৌঁছে দেখতে পেলাম, তাঁরা নদীর পাড়ে কাশবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা নৌকা দেখে দলে দলে ছুটে এসেছেন। আমাদের নৌকাটিতে প্রথম আলো বন্ধুসভার ত্রাণ-সাহায্য ছিল। বন্ধুসভার কর্মীরা তাঁদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করলেন হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে। তাঁরা বললেন, তাঁদের ঘরবাড়িতে এখনো পানি আছে। তাঁরা সাহায্যের জন্য মরিয়া হয়ে বললেন, এ পর্যন্ত তাঁরা কোনো সাহায্যই পাননি। কিন্তু শুনেছেন নদীর পশ্চিম পাড়ের বন্যাদুর্গত মানুষেরা সাহায্য পাচ্ছেন। এক নারী বললেন, ‘ওলা ওপার আসে, ওপারেই শ্যাষ হয়া যায়, এপার আর আসে না।’ এক পুরুষ বললেন, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানরা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, কারণ দুর্গত মানুষের সংখ্যা
এত বেশি যে তাঁরা সবাইকে সাহায্য দিতে পারবেন না।

এই মানুষেরা বললেন, এমনিতে খাদ্যাভাব, তার ওপর শুরু হয়েছে শিশুদের পাতলা পায়খানা আর জ্বর। আগের দিন একটি শিশু এভাবে মারা গেছে। অর্থাৎ গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ খাটিয়ামারি গ্রামে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে। ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবের কথা জানা গেল নদীর পশ্চিম পারেও। সেখানেও বন্যার পানি নেমে গেছে, দুর্গত লোকদের কেউ সরকারি ত্রাণ-সাহায্য পেয়েছেন, কেউ পাননি। নদীতে বড় নৌকা দেখলেই তাঁরা ত্রাণ-সাহায্যের আশায় নদীতীরে ছুটে আসছেন। ফজলুপুর ইউনিয়নের পূর্ব খাটিয়ামারি গ্রামের বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে বন্ধুসভার কর্মীদের ত্রাণ বিতরণের সময় আমি এক লোককে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাঁরা ত্রাণ-সাহায্য পেয়েছেন কি না। তিনি বললেন, একবার নয়, চারবার পেয়েছেন। আমি তখন অন্য লোকদের ডেকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা বললেন, তাঁরা একবারও পাননি। আগের লোকটা আস্তে করে সেখান থেকে সরে যাওয়ার পর অন্য লোকেরা আমাকে বললেন, ওই লোকটা চেয়ারম্যানের আত্মীয়। তাঁরা অভিযোগ করলেন, চেয়ারম্যান ত্রাণ-সাহায্য দিয়েছেন শুধু তাঁর বাড়ির কাছের লোকজনকে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসনের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, বন্যায় এই জেলার সাতটি উপজেলার মোট ৫ লাখ ৭২ হাজার ৭৩১ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ত্রাণ-সাহায্য হিসেবে জেলা প্রশাসন গ্রহণ করেছে ১ হাজার ৫৮৬ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য ও ৪২ লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ত্রাণ-সাহায্য কতটা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। শুধু গাইবান্ধা নয়, বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার বেশ কয়েকটি বন্যাদুর্গত জনপদের ভুক্তভোগী মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো ত্রাণ বিতরণ সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না, অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে গোড়ার সমস্যাটা হলো যাঁদের ত্রাণ দেওয়ার প্রয়োজন, সেই সব মানুষ বা পরিবারের
তালিকা তৈরি করা। যত দূর জানা গেল, এই তালিকা তৈরি করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা। তাঁরা সবাই সৎভাবে কাজটা করেননি। অধিকাংশই ভোটের কথা মাথায় রেখে নিজ নিজ সমর্থকদের নাম তালিকায় ঢুকিয়েছেন। এমন দুর্নীতির দৃষ্টান্তের কথাও শুনতে পেয়েছি যে চেয়ারম্যান কিংবা মেম্বার কোনো গ্রামের কোনো ব্যক্তিকে ওই গ্রামের দুর্গতদের নাম চেয়েছেন, সেই ব্যক্তি এমন শর্তে কোনো কোনো ব্যক্তির নাম দিয়েছেন যে ওই ব্যক্তি ত্রাণ পাওয়ার পর তাঁর কিছু অংশ তাঁকে দেবেন।

একদম তৃণমূল পর্যায়ের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা খুব জরুরি। নইলে প্রকৃত দুর্গত বিপুলসংখ্যক মানুষের ত্রাণ-সাহায্য পাওয়ার অধিকার হরণ চলতেই থাকবে। প্রয়োজনীয় পরিমাণে ত্রাণ-সাহায্য বরাদ্দ করা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু যে পরিমাণে ত্রাণ বরাদ্দ করা হয়েছে, ঠিক সেই পরিমাণেই তা দুর্গত মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া তার চেয়েও বেশি জরুরি।

মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here