বাঁচিয়ে রাখতে হবে মাতৃবাগানটি

0
22

গত ১০ ও ১৩ আগস্ট একাধিক জাতীয় দৈনিকে একটি মাতৃবাগানের সাত শতাধিক গাছ কাটা হবে মর্মে প্রকাশিত খবরটি পড়ে আঁতকে উঠেছি। খুবই বেদনাদায়ক সংবাদ। একই সঙ্গে আত্মঘাতীও। ফলবীথি জার্মপ্লাজম সেন্টার নামের এ বাগান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে ১৯৯০ সালের দিকে যাত্রা শুরু করে। তখন রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকে একটি নির্বাহী আদেশে আগারগাঁও-সংলগ্ন জাতীয় প্যারেড স্কয়ারের পশ্চিম-দক্ষিণ অংশে একটি কেন্দ্রীয় ও প্রতিনিধিত্বমূলক বাগান স্থাপনের জন্য পাঁচ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নকশার মাধ্যমে জায়গাটির যে অবস্থান চিহ্নিত করা হয়, তা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বর্তমান জাদুঘর লাগোয়া উত্তর পাশ। প্রায় ২৭ বছরের ব্যবধানে এখানে দেশি-বিদেশি ফল গাছের এক বিস্ময়কর জার্মপ্লাজম গড়ে উঠেছে। এই সফলতা স্বয়ং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। দেশে খাদ্য উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্যের পাশাপাশি ফল উৎপাদনেও ঈর্ষণীয় অর্জন রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। রাষ্ট্রের এই সফল সংস্থাটি, বিশেষত ফল গবেষণা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে কতগুলো উদ্ভিদভান্ডারের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। আগারগাঁওয়ের ৭৩৯টি ফলজবৃক্ষের এই গবেষণা উদ্যান তারই একটি।

মাতৃবাগানটির চারা-কলম থেকে প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব খাতে কয়েক কোটি টাকা যুক্ত হচ্ছে। চারা-কলমগুলো পৌঁছে যাচ্ছে দেশের অন্য হর্টিকালচার সেন্টারগুলোতে। পাশাপাশি সমৃদ্ধ হচ্ছে ঢাকার ছাদবাগানগুলো। বর্তমানে আমরা ঢাকার ছাদবাগানগুলোতে যেসব সুসজ্জিত বৃক্ষের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করি, তার সিংহভাগ অবদানই এ মাতৃবাগানের। এখানকার উন্নত জাতের কলমগুলো এক যুগের বেশি সময় ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে এমন কিছু উদ্ভিদ প্রজাতি আছে, যা মারা গেলে বা নষ্ট হলে সারা দেশ থেকেই সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন বাড়ানো ও উন্নত প্রজাতির সন্ধানে এখানে প্রতিনিয়তই নানান ধরনের প্রায়োগিক গবেষণা চলছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের শিক্ষানবিশ এখানে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

এই ফলবীথি মাতৃবাগানে মোট ৬৭ প্রকার ফলের ২৬৫ জাতের ৭ শতাধিক গাছ আছে। এর মধ্যে দুর্লভ ও সুলভ মিলিয়ে আমের জাত ৩৮, লিচু ৬, পেয়ারা ১৫, জলপাই ৪, কামরাঙা ৬, জামরুল ৮, বাতাবিলেবু ৬, লেবু ৭, নারকেল ৫, বেল ৩, করমচা ৩, কুল ৪ এবং ২ জাতের তেঁতুলসহ স্টার আপেল, নাশপাতি, সাতকড়া, মাল্টা, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, জাবাটিকাবা ও কাজুবাদাম রয়েছে। কিন্তু গত ৩১ জুলাইয়ের একটি চিঠি সম্ভাবনাময় এ বাগানের সব কর্মকাণ্ডকে বিষাদময় করে তুলেছে। হতাশায় মুষড়ে পড়েছেন বাগানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও গবেষকেরা। বিমানবাহিনী সদর দপ্তরের পাঠানো ওই চিঠিতে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানানো হয়, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য যে জায়গাটি চিহ্নিত করেছে, তা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের ব্যবহার্য পাঁচ একর জমিরই অংশ। চিঠিতে আরও জানানো হয়, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী জার্মপ্লাজম সেন্টারটির দুই হাজর স্কয়ার মিটার জমি প্রকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করা হবে।

মাতৃবাগান-সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী মেট্রোরেলের অস্থায়ী কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণের সময় বাগানের প্রায় ৮০ ভাগ গাছ কাটা পড়বে। বাকি ২০ ভাগ নির্মাণযজ্ঞের ধকলে ধ্বংস হবে। সব মিলিয়ে সমৃদ্ধ ও দরকারি এই বাগান বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কৃষি বিভাগ বাগানটির এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছে না। তারা চায় বাগানটি বেঁচে থাকুক। দেশের ফল উৎপাদনে জোরালো ভূমিকা রাখুক। অবশ্য এমন আকস্মিক ঘটনায় তাদের বিস্মিত হওয়ার যথেষ্ট যুক্তিও আছে। কারণ, এই ফলবীথি মাতৃবাগানটির কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন করার স্বার্থে ২০০০ সালেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। তাতে বাগানটি সংরক্ষণপূর্বক নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এমন একটি স্পষ্ট নির্বাহী আদেশ থাকা সত্ত্বেও সেটি কেন মানা হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়।

যানজটে নাকাল নগরবাসীর জন্য মেট্রোরেল অনেকটা আশীর্বাদের মতোই। জাতীয় স্বার্থে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পাশাপাশি কৃষি বিভাগও রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। কার্যত ও দৃশ্যত এই দুই বিভাগের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। আমাদের মেট্রোরেল যেমন দরকার, তেমনি বাগান তথা ফল-ফলারিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই কাজটির মধ্যে একটি আন্তসমন্বয় তৈরি হোক।

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বাগানটি বাঁচানোর স্বার্থে বিকল্প কোনো স্থানের কথা ভাবতে পারে। নগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং খাদ্য ও পুষ্টির প্রয়োজনে, সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থেই এটা করা উচিত। আমরা যখন প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে সারা দেশে বেশ আনন্দঘন পরিবেশে লাখ লাখ গাছের চারা রোপণ করছি, ঠিক এমন একটি মুহূর্তে ৭৩৯টি মাতৃগাছ কেটে ফেলা কোনো যৌক্তিক কাজ হতে পারে না। প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করার মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই। জাতীয় স্বার্থেই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশও যেন লঙ্ঘিত না হয়, সে দিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন।

মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। সাধারণ সম্পাদক, তরুপল্লব।

tarupallab@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here