বিচার, বিবেক, বগুড়া: মা-মেয়েকে বিচ্ছিন্ন করা কেন?

0
69

শেষ পর্যন্ত বগুড়ার ধর্ষক, তার পরিবার এবং সাঙ্গপাঙ্গদের মনোবাঞ্ছা কানায় কানায় না হলেও আধকানাটুকু পূর্ণ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মা ও মেয়েকে বাড়িছাড়া করা গেছে। তারা যেটা বেআইনে (সেটা আবার কী?) গায়ের জোরে করতে চেয়েছিল, ‘আইন’ সেটাকেই যেন কার্যকর হতে সাহায্য করল। মা-মেয়ে শুধু তাদের বাড়ি/বাসা/পাড়াছাড়াই হয়নি, অপরাধীরা যেটা চায়নি, সেটাও হয়েছে। দুজন দুজনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দুজন শুধু নয়, আসলে তিনজন—বাবা-মা-মেয়ে—কেউ আর একসঙ্গে এক বাসায় থাকতে পারছে না। মা থাকবেন রাজশাহীর ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে আর মেয়ের জায়গা হয়েছে ওই শহরেরই এক সেফ হোমে। একসঙ্গে বসে দুদণ্ড কথা বলা বা দুমুঠো ভাত খাওয়ার কথা তারা এখন স্বপ্নেও ভাবে না। মানুষ ছাড়াও জগতে আরও প্রাণী আছে, কিন্তু সবার মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ। কারণ, তার বিবেক আছে। বিবেক না থাকলে অন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের আর কোনো পার্থক্য থাকে না।

আদালত নাকি ক্ষতিগ্রস্ত, অপমানিত, ভীত ও নিরাপত্তা-আকাঙ্ক্ষীদের অভিভাবক স্বামী/পিতার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজের হাওলায় নিতে পারবেন কি না। হাত-পা বাঁধা অসহায় অভিভাবকের উত্তর কী হবে, তা আগাম জানার জন্য অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড, কেমব্রিজ হিজরতের প্রয়োজন নেই; হাতপাখা নিয়ে যেকোনো বটতলায় বসারও দরকার নেই। নিরুপায় অভিভাবক আদালতের ওপর অবিচল আস্থা রেখে তাঁর অপারগতার কথা গোপন করেননি।

‘ধান ভানতে শিবের গীত’ বলে মনে হলেও একটা ঘটনার কথা বলেই ফেলি। বিভিন্ন জেলায় কর্মরত সিনিয়র সহকারী বিচারকদের খাড়া বড়ি থোড় টাইপের প্রশিক্ষণ চলছে। শিশুদের বিষয়ে তাঁদের চিন্তা-চেতনা বাড়ানোর মহান ব্রত নিয়ে দাতাদের আয়োজনে সেই যজ্ঞে একজন জেলা পর্যায়ের বিচারক প্রশিক্ষক ছিলেন। তিনি জ্ঞান/তথ্য হালনাগাদে বিশ্বাসী একজন মানুষ। পড়াশোনা, চর্চা দুটোই করেন। তিনি একটা কেস স্টাডি দিলেন প্রশিক্ষণার্থীদের বিবেচনার জন্য। সত্য ঘটনা—বাংলাদেশের ঘটনা—একজন শিশুর অভিভাবক কে হবে আর তার প্রক্রিয়াটাই বা কী হবে, সেটা পরিষ্কার করার জন্য, বিশ্লেষণ করার জন্য এই কেস স্টাডি।

ইরাক কুয়েত দখল করে নিলে কর্মরত হাজার হাজার বিদেশি মানুষ নানা সীমান্ত অতিক্রম করে নিজ নিজ দেশে চলে আসেন। সাদ্দামের হঠাৎ আক্রমণে মারাও পড়েন অনেকে। বৃহত্তর নোয়াখালীর কোনো এক উপজেলার নিভৃত গ্রামের একজন সেই মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। দেশে তাঁর স্ত্রী আর আড়াই বছরের একমাত্র কন্যা। যাঁরা ফিরে এসেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ চিনতেন না-ফেরা সেই মানুষটাকে, তাঁর পরিবারকে। তবে তাঁরাও আসলে জানতেন না কী ঘটেছে তার ভাগ্যে। মনে করতেন, তিনি ফিরবেন। হয়েতো কোথাও আটকে আছেন। কেউ বলেন, সকালেও তাঁকে দেখেছি। কেউ বলেন, গাড়িতে চড়তে দেখেছি। আর তাঁর স্ত্রী পাগলের মতো ঘোরেন ফেরত আসা মানুষদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য। আজ ফেনী, তো কাল লক্ষ্মীপুর, পরদিন হয়তো কুমিল্লা বা চৌমুহনী, যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করতেন বা দেশ থেকে একসঙ্গে গিয়েছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে যদি একটা তথ্য পাওয়া যায়। কোনো তথ্যই শেষ পর্যন্ত আসেনি, সবই ছিল ভাসা-ভাসা। সবকিছু চুকেবুকে গেলে বছর দুয়েক পর একটা খাম আসে খবর নিয়ে। ইরাকি আগ্রাসনে কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি মারা গেছেন, তবে ক্ষতিপূরণ তাঁর স্ত্রী ও কন্যা পাবেন। পরিমাণ প্রায় ৪৪ লাখ টাকা। কেস ঠুকে দিলেন মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা। আদালত কী রায় দেবেন? আইনের আলোকে, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের আলোকে তাঁদের বিধান দিতে হবে। প্রশিক্ষণার্থীদের অপশন দেওয়া হলো, তাঁরা আপস-মীমাংসার ব্যবস্থাও করতে পারবেন। শিশুটির বেস্ট ইন্টারেস্ট বা সবচেয়ে বেশি স্বার্থ যেন রক্ষিত হয়। পাঁচ-ছয়টা দলে ভাগ হয়ে প্রশিক্ষণার্থীরা তাঁদের বিবেচনাপ্রসূত রায়/মীমাংসা উপস্থাপন করেন। বেশির ভাগের মতেই শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষার জন্য মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে মৃত ব্যক্তির ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবনা সবচেয়ে ভালো প্রচেষ্টা বলে তাঁরা মনে করলেন। তা ছাড়া প্রতি মাসে জেলা আদালতে এসে গত মাসের খরচের হিসাব দিয়ে টাকা নিয়ে যাওয়ার মতো পরামর্শও আসে। এ-ই হলো আমাদের বিবেকের অবস্থান।

এ রকম মানসিক অবস্থান বগুড়ার মতো রায়ই দেবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কারাগার, বন্ধুনিবাস বা হোম সর্বশেষ উপায় হিসেবে ভাবার কথা সব বিধিবিধানেই বলা আছে। বগুড়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা খালি বাসারও অভাব নেই। এক মেডিকেল কলেজের আবাসিক এলাকায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে জোড়ায় জোড়ায় বাসগৃহ। এর যেকোনো একটিতে নিরাপত্তাসহ থাকার ব্যবস্থা করার আদেশ দিতে পারতেন আদালত। প্রশাসনকে বলতে পারতেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, এমন ব্যবস্থা করার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যেখানে থাকতে চায়, সেখানেই তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করা কি একেবারেই অসম্ভব ছিল?ÿক্ষতিগ্রস্থ মা-মেয়ে, তথা পরিবারটির মনঃসামাজিক পুনর্বাসনের জন্য তাদের পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপনটা খুবই জরুরি, সাধারণ বিবেক-বিবেচনা তো তা-ই বলে!

কিন্তু না, যা হওয়ার তা যেন হবেই না এই বাংলাদেশে। তাই আদালতের সিদ্ধান্তে মা-মেয়ে ও বাবা তিনজন তিন জায়গায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এই হলো তাদের দেওয়া সরকারি নিরাপত্তা!

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here