মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে যেসব মনোযোগ দরকার | রোহিঙ্গা সংকট

0
176

রোহিঙ্গা সংকটটি আজ দেশজ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে একটি সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিষয়টি আবেগঘন সন্দেহ নেই, তবে সংকটটি শুধু আবেগের ব্যাপার নয়, বিবেকেরও; এটা শুধু উক্তির বস্তু নয়, যুক্তিরও; শুধু আশ্লেষণের বিষয় নয়, বিশ্লেষণেরও। সমস্যাটি শুধু বর্তমানের নয়, অতীতেরও; শুধু দেশজ নয়, আঞ্চলিকও; ক্ষণস্থায়ী নয়, দীর্ঘস্থায়ীও বটে।

তবে উপর্যুক্ত কারণগুলো যেন তিনটি তাৎক্ষণিক, আশু ও আবশ্যিক কার্যক্রম থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে না নেয়। এ কাজগুলো অনপেক্ষ, অন্য কোনো বিবেচনা এখানে পরিত্যাজ্য এবং এগুলো মধ্যমেয়াদি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম-অনির্ভর। এ কাজগুলো করতেই হবে, এখনই করতে হবে এবং বারবার করতে হবে। কারণ, এগুলো মানবিকতানির্ভর, তাড়িত ও চালিত। এ আশু ও অবশ্যকরণীয় কাজ তিনটি হচ্ছে:

প্রথমত, এ সময়ে আমাদের ‘মানবতা বাঁচাও’ পরিপ্রেক্ষিতটি শুধু বজায় নয়, বরং আরও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রোথিত করতে হবে। রোহিঙ্গা পরিপ্রেক্ষিতে মানবতা আজ বিপন্ন, মানবিকতা আজ ভূলুণ্ঠিত, লাখ লাখ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। আর্তমানবতা আজ আমাদের দুয়ারে সাহায্যপ্রার্থী। বাংলাদেশ আজ দুই হাত বাড়িয়ে আর্তমানবতাকে বুকে টেনে নিচ্ছে, সে তার সম্পদ অপ্রতুলতার কথা বিবেচনায় আনছে না, তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা ভাবছে না, তার ওপর চাপের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। এ বিবেচনাগুলো প্রয়োজনীয়, কিন্তু আশু মানবতা বাঁচাও পরিপ্রেক্ষিতে গৌণ ও অগুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রশ্নে যে মানবিক নীতি গ্রহণ করেছে, তা আমাদের মূল্যবোধ ও ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। শরণার্থীদের আত্মসম্মানকে আমরা যোগ্য মর্যাদা দেব, তাদের মানবাধিকারকে আমরা সমুন্নত রাখব, তাদের আমরা অতিথি হিসেবে দেখব, দায় হিসেবে নয়। যারা আমাদের দুয়ারে উপস্থিত, তারা ‘শরণার্থী’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ নয় এবং তাদের শুধু আর্ত মানুষ হিসেবে ভাবুন, অন্য কোনো নামাবলি তাদের গায়ে চাপানো অনুচিত। মানবতা বিস্তৃত ও ব্যাপক, রাজনীতি ক্ষুদ্র ও সীমিত।

দ্বিতীয়ত, ধিক্কার, ধিক্কার, ক্রমাগত ধিক্কার সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি, যে তার নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যে জাতিগত নিশ্চিহ্নের মতো মানবতাবিরোধী কাজে মাতে, যে তার মানুষদের দেশান্তরি হতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র ধর্ম হচ্ছে তার জনগণের নিরাপত্তা বিধান—সর্ব অঙ্গনে। রক্ষকের ভূমিকা ছেড়ে রাষ্ট্রযন্ত্র যদি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, হন্তার কাজ করে, অত্যাচারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে ঘৃণার ভাষাতেই তার প্রতিবাদ আমরা করতেই থাকব। নিন্দা সেই বৃহত্তর সমাজের মানুষের জন্যও, যারা তার সহ–মানুষকে উৎখাতের উন্মত্ততায় মেতেছে। মানবতার এ স্খলন নিন্দনীয় পৌনঃপুনিকভাবে আজ, কাল, পরশু এবং তার পরেও প্রতিদিন।

তৃতীয়ত, এ জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ এবং এ নিধনযজ্ঞ বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক নিন্দা আশু করণীয়। আর অবশ্যকরণীয় হচ্ছে শরণার্থীদের নিরাপত্তা, খাদ্য, আশ্রয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ—মানবিক কাজের জন্য তো অবশ্যই, সেই সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করার জন্যও। বিশ্বের অন্যান্য সংকটের সময়ে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর ভূমিকা প্রায়শই সুখপ্রদ ছিল না। অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, প্রক্রিয়ার যান্ত্রিকতায় আবদ্ধতা, শ্লথগতির কারণে বিভিন্ন সংকটে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর ভূমিকা নিন্দিত হয়েছে, মানবতার প্রশ্নে তার অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সংকটকে আরও ঘনীভূত হতে সাহায্য করেছে। সে প্রবণতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এটাই সুযোগ এবং এটাই সময় আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর, এটা যেন তারা ভুলে না যায়।

এ তিনটি আশু কর্তব্যকে নিশ্চিত করে পাঁচটি বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে:

এক. রোহিঙ্গা সংকট নিরসন করতে হলে শুধু বর্তমানের দিকে তাকালে চলবে না, তার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটা বোঝা দরকার। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই রোহিঙ্গারা বর্তমান মিয়ানমারে বসবাস করছে বংশপরম্পরায় এবং তাদের অবস্থান মূলত রাখাইন রাজ্যে। ধর্মবিশ্বাসে প্রধানত মুসলিম ১০ দশমিক ২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ, কিন্তু রাখাইনের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। এ জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী মিয়ানমারের নাগরিক এবং এটিই তাদের দেশ। মিয়ানমার প্রমাণ করতে প্রয়াসী যে এরা বাঙালি এবং বাংলাদেশ তাদের মাতৃভূমি। সেই সূত্রে তারা অত্যাচারের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করে রোহিঙ্গা জনগণকে দেশান্তরি করার নীতি নিয়েছে। বহুদিনের প্রচারণার ফলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রযন্ত্র গোয়েবলসের কায়দায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংখ্যাগুরুদের মধ্যেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে একটি বৈরীভাব সুনিপুণভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গারা আজ ‘পরবাসী নিজ বাসভূমে’।

দুই. দীর্ঘদিন অত্যাচারিত ও প্রবঞ্চিত হলে যেকোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা প্রতিরোধমূলক চিন্তা, সংগ্রামী মনোভাব এবং চরমপন্থা সংগঠন গড়ে উঠবেই। রাখাইনেও তার ব্যত্যয় হয়নি। ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে তদানীন্তন বার্মার রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যাচারে যখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাখাইন অঞ্চলে ইসলামি রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটে। ঠিক সে সময়েই ইরানে ইসলামি বিপ্লব, আফগানিস্তানে ইসলামি মুজাহিদদের উত্থান, কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনে মুসলিম-অসন্তোষ—এসব ঘটনাপ্রবাহ উপর্যুক্ত প্রক্রিয়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

তিন. রোহিঙ্গা সংকটের ধর্মীয়করণ সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। কারণ, সমস্যার মানবিক দিকটিই সার্বিক। তার চেয়েও বাস্তব কথা যে এর ধর্মীয়করণ বর্তমান সংকটকে ঘনীভূত করে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে রোহিঙ্গাদের জন্য এবং শরণার্থীদের আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশের জন্যও। শরণার্থীদের ‘সংখ্যালঘু ধর্মীয় সত্তাকেই’ প্রাধান্য দেওয়া হলে তাদের সার্বিক ‘মিয়ানমারের নাগরিক সত্তাকে’ খর্ব করা হবে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রযন্ত্র এর সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত করার এবং তা রক্ষার দায়িত্বের কথা অস্বীকার করার সুযোগ পাবে। আর এটা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরমপন্থীদের জন্য একটি জায়গা ও সুযোগ তৈরি করে দেবে। এবং বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তিগুলো এর সদ্ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। তাদের নিজেদের স্বার্থে।

চার. রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে নানা কারণে চীন ও ভারতের মনোভাব আমাদের অনুকূলে নয়—এটা সবার জানা। প্রশ্নটা হচ্ছে, কী করা যেতে পারে? একাধিক জিনিস, যার ক্ষেত্র দেশের ভেতরে-বাইরে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কর্ম ও বক্তব্য ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করেছে। যেমন দেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে তাঁর সফর এবং দেশের বাইরে জাতিসংঘে তাঁর সাম্প্রতিক ভাষণ নিঃসন্দেহে এ বিষয়ের প্রতি বাংলাদেশের উচ্চতম নেতৃত্বের সুদৃঢ় অঙ্গীকার সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। জাতিসংঘে তিনি বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রেখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধন ও সহিংসতা বিনা শর্তে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা; জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে একটি নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন; জাতিসংঘের মহাসচিবের একটি তদন্ত দলকে দ্রুত মিয়ানমারে প্রেরণ।

এর সূত্র ধরে কয়েকটি কাজ মধ্য মেয়াদেই করা যেতে পারে। প্রথমত, বিশ্ব জনমত তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের সব দূতাবাস সংশ্লিষ্ট রাজধানীগুলোতে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে। কূটনীতি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের দৌড় নয়, এটি একটি দীর্ঘ পথযাত্রা; এটি একটি হঠাৎ আলোর ঝলকানি নয়, এটি একটি ধারাবাহিকতা। দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় ও বহুধা পাক্ষিক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শরণার্থীদের জন্য অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী জোগাড় করার কাজটি অবিলম্বে জোরদার করা উচিত। এ ব্যাপারে জাতিসংঘকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা যেতে পারে। তৃতীয়ত, উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক না কেন, রোহিঙ্গা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জোরালো সমর্থনকে ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ। চতুর্থত, চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে চীনের কাছে পরিষ্কার করলে তার বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সম্ভব। পঞ্চমত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ ইতিবাচক জনমত গড়ে তোলা।

পাঁচ. রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান অত্যাবশ্যকীয়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং মিয়ানমারকেই তার নাগরিকদের সব অধিকার ও পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুটি প্রস্তাব প্রণিধানযোগ্য—সব রোহিঙ্গা শরণার্থীর নিরাপদ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং তাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত বাস্তবায়ন। এ সুপারিশমালার বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে।

এসব কাজ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। বিশ্বের নানা জায়গায় এর চেয়েও জটিল এবং বিস্ফোরণোন্মুখ সমস্যার সমাধান হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেই–বা তা হবে না কেন? আমাদের সামনে পথ তো দুটোই মাত্র। ‘কিছুই করা যাবে না’ বলে সবাইকে দোষারোপ করে নিরাশ হয়ে বসে থাকা অথবা গঠনমূলক বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এ সংকট নিরসনের জন্য কাজ করে যাওয়া। সিদ্ধান্তটা আমাদেরই। তবে এটুকু স্মরণে রাখা ভালো যে নৈরাশ্যের কোনো ইতিবাচক দিক নেই এবং চূড়ান্ত বিচারে মানুষের বহু অর্জন তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, শুধু ভাগ্যের ওপরে নয়।

(বর্তমান নিবন্ধের মতামতগুলো লেখকের নিজস্ব, যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত, তার নীতির প্রতিফলন নয়)।

সেলিম জাহান: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here