যে অতীত সু চি মুছে ফেলতে চান

0
61

রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিদ, অং সান এবং উ নু ছিলেন তিন প্রাণের বন্ধু। ১৯৩৬ সালের মে মাসে রেঙ্গুনের জুবলি হলে এক ছাত্র সম্মেলনের মাধ্যমে ‘অল বর্মা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ও (এবিএসইউ) গড়ে তুলেছিলেন এরাই এবং রাশিদ ছিলেন বিএসইউর প্রথম সভাপতি। এম এ রাশিদ হলেন বার্মার ইতিহাসে একমাত্র ছাত্রনেতা, যিনি একই সময় এবিএসইউ এবং আরইউএসইউ এই উভয় সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। এর কিছুদিন পরই জওহরলাল নেহরু বার্মা এসেছিলেন এবং তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য যে কমিটি করে ছাত্ররা, অং সানের প্রস্তাবমতো তাতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রাশিদই।
এম এ রাশিদকে অং সান বলতেন ‘রাশিদ ভাই’। অং সানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই তিনজনের রাজনৈতিক বন্ধুত্ব বজায় ছিল।

১৯৫৬ সালে রেঙ্গুন বিশ্বিবদ্যালয়ের আরাকান মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের মধ্যে এম এ রশীদ (পেছনের সারিতে মাঝে)।

উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে বার্মার সংবিধানের অন্যতম খসড়াকারীও ছিলেন রাশিদ। পরবর্তীকালে তিনি দেশটির শ্রমমন্ত্রীও হন।

অং সান-রশিদ-উ নু-রাজ্জাক প্রমুখের বন্ধুত্ব স্বাধীনতার উষালগ্নে বার্মায় ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যে’র যে সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, তার ভিত্তিতেই ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারিতে শান স্টেইটের পাংলংয়ে ঐতিহাসিক জাতি-সম্মেলন আহূত হয়েছিল এবং সেখানে অং সান বলেছিলেন, বার্মা হবে সব জাতির একটি ‘ইউনিয়ন’, যেখানে ‘বর্মনরা এক কায়েত পেলে অন্যরাও এক কায়েত পাবে।’ আর এই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়েই কাচিন-কারেন-শান-মুসলমান সবাই বর্মা ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল সেদিন।
অথচ আজ সেই অং সানের কন্যা বার্মাতে মুসলমান রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বই অস্বীকার করছেন। সেনাবাহিনীও বলছে, রোহিঙ্গা বলে বর্মায় কোনো বৈধ জাতিসত্তাই নেই এবং ছিলও না।
বার্মা সরকার এবং সে দেশের সেনাবাহিনী বর্তমানে বেশ জোরেশোরেই বলে থাকে, আরাকানের রোহিঙ্গারা সে দেশের নাগরিক নয়, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ।
এই দাবি যে কত স্ববিরোধী, তা বহুভাবেই প্রমাণযোগ্য। আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে সু চি ও বার্মার সেনা কমান্ডারদের যেকেউ জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে ১৯৪৮ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদ, আবুল বাশার, আবদুল গাফ্ফার, জোহরা বেগম প্রমুখ যে আরাকানের মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলো থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে দেশটির পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন বছরের পর বছর (মন্ত্রীও হয়েছিলেন!), সেটা কীভাবে সম্ভব হলো? এই ব্যক্তিরা কীভাবে নির্বাচনে দাঁড়ালেন? আকিয়াবের এমপি সুলতান মাহমুদ যে উ নুর নেতৃত্বে গঠিত ১৯৬০-এর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেটা কোন জাতিসত্তা পরিচয়ে?
এমনকি ১৯৯০-এ যখন সামরিক বাহিনীর অধীনেই বার্মায় বহুদিন পর প্রথমবারের মতো বহুদলীয় নির্বাচন হলো (যে নির্বাচনে অং সান সু চির দল নির্বাচিত হয়েও সরকার গঠন করতে পারেনি), তখন খ মিং (শামসুল আনোয়ার, বুথিডং-১), মো. নুর আহমেদ (বুথিডং-২), উ চিট লুইঙ (ইব্রাহিম, মংডু-১), ফজল আহমেদ (মংডু-২) প্রমুখ রোহিঙ্গারা কীভাবে উত্তর আরাকান থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হতে পারলেন? কীভাবে তখন আরাকানের রোহিঙ্গারা (আটটি আসনে) নিজস্ব রাজনৈতিক দল (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস পার্টি) থেকেই প্রার্থী হতে অনুমতি পেয়েছিল? আইন অনুযায়ী ওই নির্বাচনে ‘বিদেশি’ ছাড়া সবাইকেই ভোট দিতে দেওয়া হয়েছিল। তাহলে বুথিডং ও মংডুর এই রোহিঙ্গারা কাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন?

সু চির মুক্তির দাবিতে আরাকানের রোহিঙ্গাদের মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি

এ পর্যায়ে এ-ও উল্লেখ করতে হয়, বার্মার ১৯৯০-এর নির্বাচনে বিজয়ী ওপরের চারজন রোহিঙ্গা এমপির মধ্য থেকে শামসুল আনোয়ারকে অং সান সু চি ১৯৯৮ সালে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি হিসেবে ‘পিপলস পার্লামেন্ট’-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং শুধু এই ডাকে সাড়া দেওয়ার কারণে তাঁর ৪৭ বছরের জেল হয়েছিল। এমনকি শামসুল আনোয়ারের পুত্র-কন্যাদেরও ১৭ বছর করে সাজা দেওয়া হয়। অথচ সু চি উত্তর আরাকানে রোহিঙ্গাদের কোনো রূপ উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে যাচ্ছেন। প্রসঙ্গক্রমে এ-ও উল্লেখ করতে হয়, ১৯৯০-এর নির্বাচনে বুথিডং-১ থেকে নির্বাচিত এমপি মাস্টার শামসুল আলম রেঙ্গুনের ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিকস থেকেই তাঁর ব্যাচেলর ডিগ্রি নিয়েছিলেন এবং ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি সরকারি মাধ্যমিক একটি স্কুলের হেডমাস্টার পর্যন্ত ছিলেন। নাগরিক না হলে তাঁর পক্ষে কীভাবে দীর্ঘ শিক্ষা ও কর্মজীবন পরিচালনা করা সম্ভব হলো?
বস্তুতপক্ষে এটা বড় দুর্ভাগ্যের বিষয়, বার্মার শাসকেরা শামসুল আলমের মতো নিয়মতান্ত্রিক পথে রাজনীতিতে সক্রিয় রোহিঙ্গাদের পুরো নাগরিক পরিমণ্ডল থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে কেবল জঙ্গিপনার পথই কেবল খোলা থাকে। তবে মূলধারার রোহিঙ্গাদের এ জন্য ধন্যবাদ দিতে হয় যে গণহত্যার মুখোমুখি হয়েও তারা প্রাণভয়ে অন্য দেশে চলে এলেও আরকান কিংবা আরাকান-বহির্ভূত বার্মায় সন্ত্রাসে লিপ্ত হচ্ছে না। যদিও তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণের জন্য অং সান ও জেনারেল মিন দুজনই বৈশ্বিক পরিসরে বেশ চেষ্টা করছেন কিন্তু ইউটিউবের অস্পষ্ট কিছু ভিডিও ক্লিপ ছাড়া তাদের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভান্ডারে কার্যত এখনো বাস্তব কিছু নেই।

সুচির আইনী উপদেষ্টা উ কো নি মিয়ানমারের সংবিধানের ওপর এনএলডি দলের এক সভায় আলোচনা করছেন

বার্মার মুসলমান নেতৃত্বকে মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এ বছরের ২৯ জানুয়ারি হত্যা করা হয় ব্যারিস্টার উ কো নিকে। সু চির আজকের অবস্থানের পেছনে তাঁর অবদান অস্বীকারের উপায় নেই। যখন সন্তানদের বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার অজুহাতে সামরিক জান্তা অং সান সু চির সাংবিধানিক পদ গ্রহণে বাধা তৈরি করে, তখন একটা উপায় বের করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ কো নি। সামরিক জান্তার সংবিধানের ভেতরই তিনি বিকল্প সরকারপ্রধান হিসেবে সু চির জন্য স্টেট কাউন্সেলর পদ সৃষ্টির পথ দেখিয়ে দেন। দীর্ঘদিন সু চির আইনি উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের পর ২০১৩ সালে সরকারি দল এনএলডিতে যোগ দেন। সামরিক বাহিনীর সমালোচনা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া ১৯৮২ সালের আইনের সমালোচনা করাই হয়তো ছিল তাঁর অপরাধ। সাবেক এক সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তার নির্দেশে গুলি করে তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বার্মার জাতীয় রাজনীতিতে মুসলমানদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসও আপাতত অবসিত হয়। ঘটনার এক মাস পর অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় সু চি এই হত্যাকাণ্ডকে সন্ত্রাসী কাজ বলে কো নি-কে শহীদ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজ সন্ত্রাসীরা তাঁর বন্ধু হয়েছে, আর বন্ধু হয়েছে শত্রু।

আলতাফ পারভেজ: সাংবাদিক ও গবেষক

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here