রোহিঙ্গা ইস্যু | নারী শরণার্থীদের দিকে মনোযোগ দিন

0
33

এটা একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্ন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কষ্টের কথা, তাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার যন্ত্রণা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ভয় এবং তাদের দুর্দশা বর্ণনা করার মতো কোনো ভাষা নেই। কবে তাদের এই দুর্দশা কাটবে, তা কেউ বলতে পারে না। বাংলাদেশের জনগণ মানবতার প্রকৃত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সীমিত জায়গা, খাদ্য ও তহবিল সেই সব অসহায় মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে, যারা নিজেদের ভূমি থেকে নির্দয়ভাবে উৎখাত হয়েছে।

যত দিন যাচ্ছে, ততই শরণার্থীদের ঢল নামছে। তাদের টেকসই সহায়তার জন্য আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কয়েকটি নির্ধারিত স্থানে স্থায়ী শরণার্থীশিবির গড়ে তোলা, সমন্বিত ত্রাণ কার্যক্রম এবং শরণার্থীদের প্রয়োজন বুঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ।

শরণার্থীদের সহায়তায় আন্তরিকতা এবং অক্লান্ত প্রচেষ্টা থাকার পরও একটি বিষয় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। শরণার্থী নারী ও কিশোরীদের বিশেষ চাহিদা বা প্রয়োজনের দিকে সেভাবে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও নারীরা তাদের পরিবারকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখার জন্য অসম্ভব ধৈর্য প্রদর্শন করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এটি সম্ভবত খুব সামান্যই সত্য যে বেশির ভাগ পুরুষ সীমান্ত অতিক্রম করেনি। হয় তাদের হত্যা করা হয়েছে অথবা অধিকার আদায় করতে লড়াই করার জন্য তারা ফিরে গেছে।

নারী ও কিশোরীদের সমস্যা বহুবিধ। এর মধ্যে একটি হচ্ছে মাসিক বা পিরিয়ড হওয়া। আমাদের মতো সমাজে এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু এটাই বাস্তবতা যে একটা বয়সে পৌঁছানোর পর সব মেয়েরই মাসিক হয়। এটি মেয়েদের একটি বিশেষ অবস্থা। শরণার্থী নারী ও কিশোরীরা কীভাবে এই বিশেষ অবস্থা মোকাবিলা করছে, যেখানে তাদের এখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছু নেই।

সিরিয়ার শরণার্থী সংকটের সময়, কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা নারীদের ‘ডিগনিটি কিট’ নামে একটি ব্যাগ দিয়েছিল। এই ব্যাগের মধ্যে ছিল স্যানিটারি প্যাড, পরিষ্কার কাপড়, সাবান, প্যাড ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়ার জন্য প্যাকেট এবং আরও কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস। ভারতেও দুর্গত নারীদের মাঝে এ রকম ‘ডিগনিটি কিট’ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে শাড়ি ছিল।

বাংলাদেশের ত্রাণকর্মীরা রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের মাঝে এ রকম ‘ডিগনিটি কিট’ সরবরাহ করতে পারেন, যাতে তারা পিরিয়ডের সময় বা অন্য কোনো সময় মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে, নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারে। যদি জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য পুরুষদের মাঝে কনডম বিতরণ করা যেতে পারে, তাহলে নারীদের মাঝে বিনা মূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ অনেক বেশি যৌক্তিক। নিরাপদ যৌনকাজের জন্য আরও অনেক উপায় আছে কিন্তু মেয়েরা তাদের মাসিক কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কারণ, এটা প্রাকৃতিক একটি বিষয়।

এর ওপর তাদের নিরাপত্তার বিষয় আছে। সাধারণত দেখা যায়, শরণার্থীশিবিরগুলোতে নারী-পুরুষ একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার ফলে নারীদের প্রায়ই যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। ল্যাট্রিন ব্যবহারের প্রয়োজনে নারীরা রাতের অন্ধকারে বাইরে বের হয়। আর এ পরিস্থিতির সুযোগ নেয় পুরুষেরা। এ ধরনের দুর্যোগের সময় যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ধর্ষণ খুবই সাধারণ ঘটনা। এমনকি খাওয়ার পানি আনতে গেলেও নারীদের প্রায়ই একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।

রোহিঙ্গা শরণার্থী নারীদের ক্ষেত্রেও যে এমনটি ঘটবে না বা ঘটছে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই নারীদের দিকে বিশেষ করে নজর দিতে হবে। রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীরা পাচারের ঝুঁকিতেও রয়েছে। আকর্ষণীয় চাকরি ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের দেহব্যবসা করার জন্য পাচার করা হতে পারে। তাদের অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে। অল্পবয়সী ছেলেরাও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।

তাহলে এখন কী করা উচিত? বিশেষ করে নারী শরণার্থীদের জন্য কীভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে? সরকার, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। নারী ও মেয়েশিশুদের প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। একটি উদ্বাস্তু–জীবন খুবই কষ্টদায়ক। নারীদের সেই কষ্টকে আর বাড়তে দেওয়া উচিত হবে না।

শারমীন আক্তার: সাংবাদিক। (bangladeshnews24.org)

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here