বাংলাদেশের কিশোরীরা

0
147

‘কিশোরী মেয়েদের ঠেকানোর জন্য আপনার হাতে বিশেষ কোনো কৌশল আছে?’
ভারতীয় কোচ সাজিদ ধরকে প্রশ্নটি করে ভ্রু কুঁচকে উত্তরের অপেক্ষায় থাকলেন কলকাতার এক সাংবাদিক। সংবাদ সম্মেলনে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন সাজিদ ধর। কিন্তু দেখে মনে হলো, উত্তর দিয়ে না স্বস্তি পেয়েছেন ভারতীয় কোচ, না আশ্বস্ত হতে পেরেছেন প্রশ্নকর্তা। ‘সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক করা স্বপ্নাকে থামাতে পারবেন তো?’ এবার শুধু মাথা নাড়িয়েই কাজ সারলেন সাজিদ ধর।

নয় মাস আগের কথা। প্রথমবারের মতো নারী সাফ ফুটবলের ফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ আগের টানা তিন আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারত। শিলিগুড়িতে ফাইনালপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্ন আটকে ছিল কাচের ঘরটির মধ্যেই। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় ফুটবল সাম্রাজ্য গেড়ে বসা ভারতের কোচের উত্তরগুলো সেই সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছিল বহু দূর। ফাইনালের আগে বাংলাদেশের কিশোরীরা যে তাঁর রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে, সে কথাই শুধু সেদিন তিনি মুখ ফুটে বলতে পারেননি। কিন্তু চোখ-মুখ দেখেও তো কিছু পড়ে নেওয়া যায়, নাকি!

সাফের ২০ সদস্যের বাংলাদেশ দলে ১৫ জনই ছিল অনূর্ধ্ব-১৬ দলের। ফাইনালের বড় মঞ্চে অভিজ্ঞ ভারতের বিপক্ষে তারা আর কুলিয়ে উঠতে না পারায় ৩-১ গোলে হার। কিন্তু শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘাকে তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল, এবার না পারলেও সামনে ট্রফিগুলো তাদের চাই। ভারতীয় কোচ সাজিদ ধর থেকে শুরু করে নেপাল ও আফগানিস্তানের কোচও বলেছিলেন, সাফের গণ্ডি ছড়িয়ে এএফসির টুর্নামেন্টেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

প্রথমবারের মতো এএফসির বড় মঞ্চে খেলে ফেলেছে বাংলাদেশ। তো এমন মঞ্চে পা রাখার অভিজ্ঞতাটা কেমন হলো বাংলাদেশের কিশোরীদের? বর্তমান চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৯ গোল হজম করে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু করেছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে বর্তমান রানার্সআপ জাপানের বিপক্ষে ৩-০ গোলে হার ও শেষ ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩-২ গোলে লড়াকু হার। অর্থাৎ দুই গোল দেওয়ার বিপরীতে ১৫ গোল হজম করেছে গোলাম রব্বানীর শিষ্যরা। কিন্তু ১৫ গোল হজম করাটাই কি শেষ কথা? এই মেয়েরা কি কোনো বার্তা দিচ্ছে না?

পাওয়া যাবে অনেক ভালোর ইঙ্গিতই। বিশ্ব ফুটবলের সব শক্তিশালী দেশের বিপক্ষে লড়েছে মেয়েরা। জাপান ও উত্তর কোরিয়ার কাছে নারী বিশ্বকাপই হয়ে পড়েছে পাড়ার টুর্নামেন্টের মতো। তবু উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৯ গোলে হারাটা যে ছিল দুর্ঘটনা, সেটা পরে প্রমাণ করে দিয়েছে মেয়েরা। ভুলত্রুটি শুধরে জাপানের বিপক্ষে হেরেছে ৩-০ গোলে। বড় উন্নতির ছায়া। আর শেষ ম্যাচে ১০ খেলোয়াড় নিয়েও অস্ট্রেলিয়াকে ছেড়ে কথা বলেনি বাংলাদেশ। লড়াই করে হার ৩-২ গোলে।

তাই ১৫ গোল হজম করা বাংলাদেশকে নিয়েও দেখা যায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন। যারা ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এশিয়ার সেরা আটটি দেশেও জায়গা করে নিয়েছে এবং সেখানেও দেখিয়েছে উন্নতির ধারাবাহিকতা, তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায় বলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃষ্ণা-বাহিনী নিয়ে স্তুতি। সমর্থক গ্রুপগুলো ফেসবুক পেজের কভার ফটোতে সেঁটে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা বাংলাদেশ একাদশের ছবি। লিখে দিয়েছে, ‘পৃথিবী এবার এসে বাংলাদেশকে নাও চিনে’। তিন ম্যাচে ১৫ গোল হজমের পরও যে সমর্থকদের মন জয় করা যায়, তা কৃষ্ণারা দেখিয়ে দিল।

বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় মেয়েদের সাফল্যই এখন ফুটবলে একমাত্র আলোর রেখা। ফাইল ছবিকৃষ্ণাদের ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ নারী ফুটবলের আরও বড় মঞ্চেও যেতে পারবে বলে মনে করেন দেশের অন্যতম সেরা কোচ সাইফুল বারি, ‘এই মেয়েরা ছোটবেলা থেকে খেলা শিখে আসেনি। অথচ কয়েক বছরের মধ্যেই জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের সঙ্গে ফাইট করছে। এটাই অনেক বড় কিছু। একটি ব্যাচ তৈরি হয়েছে। এখন ধরে রাখতে হবে।’ কিন্তু এই দলের পেছনে পরবর্তী নতুন ব্যাচ তৈরি না হলে সব উদ্যোগই যে ধুলোয় মিশে যাবে, সে কথাও জানিয়ে রাখলেন টিটু।

আশার কথা হলো, বাফুফে পরবর্তী ব্যাচ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখাতে না পারলেও বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) তৈরি হয়েছে নতুন একটি ব্যাচ, যারা ইতিমধ্যে ভারতের সুব্রত কাপ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। শিরোপার সঙ্গে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হয়েছে বিকেএসপির গোলরক্ষক রুপনা চাকমা। ফাইনাল সেরা হয়েছে রেহেনা পারভীন।

কৃষ্ণা, সানজিদাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি হচ্ছে রুপনা, রেহেনাদের দলটিও। মিলেমিশে তারাই তো ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। যারা দুমড়ে-মুচড়ে ফেলবে বাঘা বাঘা দলকেও। এমন স্বপ্ন দেখেই জেগে উঠছে প্রায় ঘুমিয়ে পড়া ফুটবল অঙ্গন।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here